আজকের বাণী

দৈনন্দিন নিয়ম, প্রজ্ঞাময় ও করুণাময় জীবনের সূচনা

2026 . 10 . 29

বৌদ্ধ সাধনায় দৈনন্দিন নিয়ম (ইলগোয়া, 日課) বলতে বোঝায় প্রতিদিন নিজে স্থির করে যে সাধনা পালন করেন। পূজা-নিবেদন ও প্রণাম করা, সূত্র পাঠ করা, সন (Seon) ধ্যানে বসা, এবং নিজের দেহ ও মনকে দেখা, সবই দৈনন্দিন নিয়মের অন্তর্গত।

তবে সাধকের দৈনন্দিন নিয়ম শুধু নির্ধারিত সময়ের সাধনা নয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে রাতে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনে যে প্রতিটি মুহূর্তের মুখোমুখি হন, তা কীভাবে যাপন করেন, সেটিও এর অংশ।

বৌদ্ধ ধর্মে একটি কথা আছে: ইলিল সি হোইল (日日是好日), অর্থাৎ "প্রতিটি দিনই ভালো দিন"।

প্রতিটি দিন ভালো দিন হওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিদিন শুধু ভালো ঘটনাই ঘটে বা কোনো কষ্ট থাকে না। আনন্দের দিন আছে, কষ্টের দিনও আছে; যেদিন সবকিছু ইচ্ছামতো হয়, আবার যেদিন হয় না। যে পরিস্থিতিরই মুখোমুখি হন না কেন, গুরুত্বপূর্ণ হলো তাতে অতিরিক্ত ভেসে না যাওয়া এবং নিজের মনকে সঠিকভাবে দেখে জীবন যাপন করা।

অতীত চলে গেছে, ভবিষ্যৎ এখনো আসেনি। যা গেছে তার জন্য অনুশোচনা এবং যা আসেনি তার জন্য দুশ্চিন্তা করতে করতে আপনি যে বর্তমান মুহূর্তে সত্যিই বেঁচে আছেন, তা সহজেই হাত ফসকে যায়।

আপনি সত্যিকারের যে সময়ে বাঁচতে পারেন, তা কেবল এখন। তাই এই মুহূর্তটি কীভাবে কাটান, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মুহূর্তকে ভালোভাবে যাপন করলে দিনটি ভালো হয়; প্রতিটি দিন ভালোভাবে যাপন করলে সপ্তাহটি ভালো হয়। এভাবে তা মাস হয়, বছর হয়, দশ বছর হয়ে একটি পূর্ণ জীবন গড়ে তোলে।

জীবনের এই প্রবাহ শুধু এই জন্মে সীমাবদ্ধ নয়। বহু জন্ম ধরে, জন্মের পর জন্ম চলতে থাকা কারণ-পরিস্থিতি (conditions) ও কর্মের দৃষ্টিতেও একে দেখা যায়। এখন আপনি যে মন জাগান এবং যে কাজ করেন, তা আগামী জীবন গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে ওঠে।

আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সমাজ অতীতের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও সুবিধাজনক হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও মানসিক চাপও বেড়েছে।

মানুষ আরও বেশি শিখতে, আরও বেশি পেতে, আরও দ্রুত সফল হতে অবিরাম চেষ্টা করে। উন্নতির জন্য চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই পথে যদি নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন, যা এখনো অর্জন করেননি তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, এবং যা ইতিমধ্যে আছে তাতে তৃপ্ত হতে না পারেন, তাহলে জীবন ক্রমশ কষ্টকর হয়ে উঠতে বাধ্য।

এমন যুগ যত বেশি, বৌদ্ধ সাধনা তত বেশি অর্থবহ হয়।

সাধনা মানে বাস্তবতা ছেড়ে কোনো বিশেষ জগতের খোঁজে যাওয়া নয়। যেখানে বাস করেন, ঠিক সেখানেই নিজের মনকে দেখা, যা করা দরকার তা আন্তরিকভাবে করা, এবং লোভ, দ্বেষ ও মোহে বিচলিত না হওয়ার চেষ্টা করাই সাধনা।

দৈনন্দিন নিয়ম ভালোভাবে যত্ন করা মানে শুধু অনেক কাজ শেষ করা বা পরিকল্পিত সবকিছু সম্পূর্ণ করা নয়। কাজের সময় আন্তরিকভাবে কাজ করা, মানুষের সঙ্গে দেখা হলে উষ্ণভাবে আচরণ করা, কঠিন পরিস্থিতিতে প্রজ্ঞার সঙ্গে বিচার করা, এবং মনে ক্লেশ জাগলে তা অবহিত হওয়া, এসবই এর অর্থ।

কখনো কখনো আপনি ভুল করবেন, ব্যর্থও হবেন। তখনও যদি নিজেকে ফিরে দেখে আবার সঠিক দিকে এগোতে পারেন, সেই দিনটিও সাধনার একটি মূল্যবান সময় হয়ে ওঠে।

প্রজ্ঞা বেড়ে ওঠে নিজের মন ও জীবনকে সঠিকভাবে দেখা থেকে। সেই প্রজ্ঞার ভিত্তিতে নিজেকে ও অন্যদের উষ্ণভাবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে করুণা অনুশীলিত হয়।

প্রতিটি মুহূর্তে নিজের মনকে দেখলে এবং দৈনন্দিন নিয়মকে মূল্যবান মনে করলে, তীব্র প্রতিযোগিতা ও উদ্বেগের মধ্যেও আপনি আরেকটু শান্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে বাঁচতে পারেন।

দিনগুলো জমে একটি পূর্ণ জীবন হয়, আর প্রতিটি মুহূর্তের মন ও কর্ম জমে আপনার জীবন গড়ে তোলে।

তাই দূর ভবিষ্যতের সুখের অপেক্ষায় থাকবেন না; আজকের দিনটিকে ভালোভাবে যাপন করুন।

গতকাল চলে গেছে, আগামীকাল এখনো আসেনি। এই মুহূর্তটিকে প্রজ্ঞা ও করুণার সঙ্গে যাপন করাই সাধনা, এবং প্রতিটি দিন ভালো দিন হওয়ার প্রকৃত অর্থ।

আজ যে কাজ শুরু করবেন, তখন একটু থেমে নিজের মনকে দেখুন। যদি অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেন বা যা এখনো আসেনি তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন, তা অবহিত হোন, এবং এখন যা করছেন তাতে আন্তরিকভাবে মন দিন।

মানুষের সঙ্গে দেখা হলে তাদের সঙ্গে উষ্ণভাবে আচরণ করুন। কঠিন পরিস্থিতিতে মনে জেগে ওঠা রাগ ও উদ্বেগকে দেখুন এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে বিচার করুন। ভুল করে ফেললে নিজেকে ফিরে দেখুন এবং আবার সঠিক দিকে এগোন।

ঘুমিয়ে পড়ার আগে আজ কোন মন নিয়ে কাজ করেছেন ও মানুষের সঙ্গে আচরণ করেছেন, তা ফিরে দেখুন। কত কাজ শেষ করেছেন শুধু তা নয়, সেই মুহূর্তগুলো কীভাবে যাপন করেছেন তা দেখাও দৈনন্দিন নিয়মের অংশ।

এই মুহূর্তে নিজের মনের দিকে তাকিয়ে প্রজ্ঞা ও করুণার সঙ্গে বেঁচে থাকাই দিনের সাধনা, আর সেই দিনগুলো জমে গড়ে ওঠে একটি পূর্ণ জীবন।

দৈনন্দিন নিয়ম মানে শুধু নির্ধারিত সময়ে প্রণাম নিবেদন, সূত্র পাঠ ও সন (Seon) ধ্যান নয়। সকালে চোখ খোলা থেকে রাতে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে নিজের মনকে দেখাই এর অর্থ।

"প্রতিটি দিনই ভালো দিন" কথাটির অর্থ শুধু কষ্টহীন দিন নয়। আনন্দ ও কষ্টের মধ্যেও মনকে সঠিকভাবে দেখা, যা করা দরকার তা আন্তরিকভাবে করা, এবং নিজেকে ও অন্যদের উষ্ণভাবে গ্রহণ করার মধ্যেই এর তাৎপর্য।

ভুল করার দিনেও আপনি নিজেকে ফিরে দেখে আবার সঠিক দিকে এগোতে পারেন। গতকাল চলে গেছে, আগামীকাল এখনো আসেনি। এই মুহূর্তটিকে প্রজ্ঞা ও করুণার সঙ্গে যাপন করুন। সেই মুহূর্তগুলো জমে একটি দিন হয়, আর সেই দিনগুলো জমে একটি পূর্ণ জীবন হয়।

অনুবাদ জানাও
দৈনন্দিন নিয়ম, প্রজ্ঞাময় ও করুণাময় জীবনের সূচনা
দৈনন্দিন নিয়ম, প্রজ্ঞাময় ও করুণাময় জীবনের সূচনা কার্টুন
  1. আপনার দিন শুরু হয় সকালের রান্নাঘরে পরিজ নাড়ার আঙুলের ডগাতেও।
  2. তুলনা ও দুশ্চিন্তা জাগলে অবহিত হোন, আর এখন যা করছেন তাতে ফিরে আসুন।
  3. কারও সঙ্গে দেখা হলে একটি পাত্রে ভরা উষ্ণ হৃদয় তুলে দিন।
  4. ভুলের দিনেও নিজেকে ফিরে দেখুন, আর আবার সঠিক দিকে এগোন।
  5. ঘুমের আগে দেখুন কতটা করলেন, আর কোন মন নিয়ে করলেন।